গাইবান্ধা সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিলের পাতা কাটাছেঁড়া এবং বালাম বইয়ের পাতা গায়েব করে কোটি টাকার সরকারি রাজস্ব আত্মসাতের এক ভয়ংকর দুর্নীতি প্রকাশ্যে এসেছে। জমিজমার কাগজপত্রের নিরাপত্তার শেষ আশ্রয়স্থল মহাফেজখানা বা রেকর্ড রুমেই চলছে এই জালিয়াতির মহোৎসব। সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) গণশুনানিতে ভুক্তভোগীদের লিখিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে এই শক্তিশালী সিন্ডিকেটের চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসে।
সরকারি রাজস্ব হারানোর পাশাপাশি এই চক্রের কারণে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। এমনকি জালিয়াতির শিকার হয়ে তীব্র দুশ্চিন্তায় প্রাণ হারিয়েছেন সাদা মিয়া নামে এক দলিল লেখক। মহাফেজখানায় কড়া বিধিনিষেধ থাকার কথা থাকলেও কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের যোগসাজশে সেখানে দালাল ও বহিরাগতদের অবাধ যাতায়াত লক্ষ্য করা গেছে।
তদন্তে জানা গেছে, ২০২১ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত তৎকালীন সাব-রেজিস্ট্রার রজব আলীর কর্মকালে ১ হাজার৯৩টি দলিলে ভয়ংকর অনিয়ম হয়েছে। নকল নবিশরা যখন মূল ভলিউম নকল করেন, ঠিক তখনই দলিলের পাতা কাটাছেঁড়া বা ঘষামাজা করে নাম পরিবর্তন করা হয়। মাস্টারপাড়ার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম দুদকের গণশুনানিতে অভিযোগ করে জানতে পারেন, ঘষামাজা করে তাঁর জমির দলিল থেকে নামই মুছে ফেলা হয়েছে।
অন্যদিকে পে-অর্ডারের মাধ্যমে জমা দেওয়া লাখ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা না করে আত্মসাৎ করেছে এই সিন্ডিকেট। ব্যাংকার আব্দুল মজিদ মিয়া ৪ লাখ টাকা রাজস্ব দিয়ে জমি কেনার চার বছর পর জানতে পারেন তাঁর দলিল রেজিস্ট্রিই হয়নি। নিবন্ধন দফতরের মহাপরিদর্শক তৎকালীন সাব-রেজিস্ট্রার রজব আলীকে আত্মসাৎকৃত রাজস্বের অবশিষ্ট ৫৮ লাখ টাকা পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছেন।
রেকর্ড রুম থেকে এভাবে বালাম বইয়ের পাতা গায়েব হওয়ার ঘটনায় সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। দুর্নীতির দায়ে ইতিমধ্যে অফিস সহায়ক আনিছুরকে সাময়িক বরখাস্ত এবং নকল নবিশ মিজানকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। মাস্টাররোল কর্মচারী হয়েও মিজানুর রহমান দ্বিতল ভবন, গাড়ি ও বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক বনে গেছেন।
তবে ভুক্তভোগী ও দলিল লেখক সমিতির দাবি, শুধু বিভাগীয় ব্যবস্থা বা টাকা ফেরত দেওয়াই যথেষ্ট নয়। এই জালিয়াতির সাথে জড়িত মূল রাঘব-বোয়ালদের বিরুদ্ধে এখনও কোনো দৃশ্যমান ফৌজদারি বা আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। জেলা রেজিস্ট্রার জহুরুল হক জানিয়েছেন, পুরো বিষয়টি নিবন্ধন দফতরের মহাপরিদর্শককে জানানো হয়েছে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া বর্তমানে চলমান রয়েছে।
