শব্দদূষণ সহনশীলতার মাত্রা ছাড়িয়ে বিপন্ন জনস্বাস্থ্য ও শান্তির শহর
এক সময়ের শান্ত ও সবুজ শহর খুলনা এখন তীব্র শব্দদূষণের নগরীতে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে খুলনায় শব্দের তীব্রতা সাধারণ সহনীয় মাত্রা বহুলাংশে ছাড়িয়ে গেছে। হাইড্রোলিক হর্নের যথেচ্ছ ব্যবহার ও যত্রতত্র মাইক বাজানোয় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন নগরবাসী।
পরিবেশ অধিদপ্তরের নীরব ঘোষিত এলাকাতেও যানবাহনের হর্ন থেকে সাধারণ মানুষের রক্ষা নেই। মূলত দূষণরোধে কার্যকর ও টেকসই কোনো প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেই বললেই চলে। এতে করে খুলনায় শব্দদূষণের ভয়াবহ চিত্র জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এলাকাভিত্তিক দূষণের ডেসিবল মাত্রা
সাধারণত সুস্থ একজন মানুষ ৪০ থেকে ৪৫ ডেসিবল পর্যন্ত শব্দ স্বাভাবিকভাবে শুনতে পারে। অথচ পরিবেশ অধিদপ্তর খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়ের অনুসন্ধানে এক ভয়াবহ চিত্র সামনে এসেছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত ছয় মাসের তথ্য নেওয়া হয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত মে মাসে দৌলতপুরে সর্বোচ্চ ৮৮.৯ ডেসিবল মাত্রার শব্দদূষণ রেকর্ড করা হয়েছে। এছাড়া সোনাডাঙ্গায় ৮৬.৭ ডেসিবল ও শিববাড়ী মোড়ে ৮৫.৪ ডেসিবল শব্দের তীব্রতা পাওয়া যায়। গল্লামারীতে ৮৪.২ ডেসিবল এবং নিউমার্কেট এলাকায় ৮৩.৫ ডেসিবল মাত্রা পাওয়া গেছে।
নতুন রাস্তা এলাকায় ৮০.৫ ডেসিবল ও বয়রা বাজারে ৭৮.২ ডেসিবল দূষণ রেকর্ড করা হয়েছে। এমনকি জিরোপয়েন্ট এলাকাতেও শব্দের তীব্রতা ছিল প্রায় ৭৬.৭ ডেসিবল। এই পরিসংখ্যান থেকে খুলনায় শব্দদূষণের ভয়াবহ চিত্র কতটা প্রকট তা সহজেই অনুমেয়।
পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযান ও আইনি পদক্ষেপ
পরিবেশ অধিদপ্তর খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক মিহির লাল সরকার এই পরিস্থিতি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, খুলনা মেডিকেল কলেজ ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে নীরব এলাকা ঘোষণা করা হয়েছে। শব্দদূষণকারীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট বা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে।
গত ডিসেম্বর থেকে মে পর্যন্ত মোট ৯১টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে। এই অভিযানে বিভিন্ন যানবাহনের বিরুদ্ধে ৩৩১টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। একই সাথে ৪ লাখ ৬৮ হাজার ৯০০ টাকা আর্থিক জরিমানাও আদায় করা হয়।
অভিযানকালে চালকদের কাছ থেকে নিষিদ্ধ ৫১০টি ক্ষতিকর হাইড্রোলিক হর্ন জব্দ করা হয়েছে। বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক সরদার শরীফুল ইসলাম জানান, শুধু মে মাসেই ৪৬টি মামলা দেওয়া হয়েছে। মে মাসে ৫৯টি হাইড্রোলিক হর্ন স্পটেই জব্দ করা হয়েছে।
পরিবেশবাদী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের গভীর ক্ষোভ
সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ অনুযায়ী নিষিদ্ধ হর্ন ব্যবহারে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। তবে এই আইনি শাস্তি কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় পরিবেশবাদীরা। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) খুলনার সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট মো. বাবুল হাওলাদার গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, শান্তির শহর খুলনা এখন পুরোপুরি শব্দদূষণের নগরীতে পরিণত হয়েছে। উৎসব এলেই পটকা ও আতশবাজি ব্যবহারের প্রতিযোগিতায় কান ঝালাপালা হয়ে যায়। নিয়মিত অভিযান না থাকায় কিছুদিন পর আবারও চালকেরা হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহার শুরু করে।
ইউনি ভিশনের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক মোহাম্মদ হেলাল হোসেন জানান, ময়লাপোতা মোড়ে সারাক্ষণ হর্ন বাজতেই থাকে। অকারণে হর্ন বাজানো খুলনা শহরের চালকদের এক ধরণের মরণঘাতী অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। বেপরোয়া চালকদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।
স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নাক, কান, গলা বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান ডা. মো. কামরুজ্জামান বলেন, এই উচ্চ শব্দদূষণ মানুষের শ্রবণশক্তি ক্রমান্বয়ে ধ্বংস করে দিচ্ছে। উচ্চশব্দের কারণে হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, অনিদ্রা ও স্নায়ুতন্ত্রের ওপর প্রচুর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে।
দীর্ঘদিন যাবৎ কেউ এই উচ্চশব্দের মধ্যে থাকলে সে চিরতরে বধির হয়ে যেতে পারে। কোমলমতি শিশু ও গর্ভবতী নারীরা এই দূষণের কারণে সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন। তিনি দেশের স্বার্থে হাইড্রোলিক হর্ন আমদানি সম্পূর্ণ বন্ধের জোর দাবি জানান।
