খুলনায় কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধ: জিম্মি নগরীতে চরম আতঙ্ক!

খুলনায় কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধ

৩০টি গ্যাংয়ের চারণভূমি রূপসা থেকে দৌলতপুর, আতঙ্কে নগরবাসী

খুলনায় কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধ এবং ভয়ঙ্কর ‘কিশোর গ্যাং’ কালচার জেলাজুড়ে মারাত্মকভাবে ডালপালা মেলেছে। রূপসা থেকে দৌলতপুর—গোটা শিল্পনগরী খুলনা এখন প্রায় ৩০টি কিশোর গ্যাংয়ের চারণভূমিতে পরিণত হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ১০টি গ্রুপ এতটাই বেপরোয়া যে, এদের দুই শতাধিক দুর্ধর্ষ ও অস্ত্রধারী সদস্যের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে নগরীর অপরাধ সাম্রাজ্য। প্রকাশ্য দিবালোকে খুন, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার এবং ইভটিজিংয়ের মতো অপরাধ ঘটিয়ে বীরদর্পে ঘুরে বেড়াচ্ছে এই কিশোর অপরাধীরা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাঠপর্যায়ের চরম নিষ্ক্রিয়তা ও গোয়েন্দা ব্যর্থতার কারণে শান্তির শহর খুলনা এখন সাধারণ মানুষের জন্য এক আতঙ্কের নগরী।

জামিনে ফিরেই হিংস্র ‘ডেঞ্জার’ ও ‘গোল্ডেন বয়েজ’

অনুসন্ধানে ও গোয়েন্দাদের অভ্যন্তরীণ তথ্যমতে, খুলনায় সুনির্দিষ্ট কোনো সরকারি তালিকা না থাকলেও ৩০টি গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ও দুর্ধর্ষ গ্যাংগুলো হলো— ‘গোল্ডেন বয়েজ’, ‘ডেঞ্জার বয়েজ’, ‘টাইগার টিম’, ‘কিং অব রূপসা’, ‘টিপসি গ্রুপ’ এবং দৌলতপুরের সিনিয়র-জুনিয়র গ্রুপ। গত দুই বছরে এই বাহিনীর সদস্যদের হাতে অন্তত শতাধিক ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।

পুলিশ ও র্যাব-৬ এর অভিযানে এ পর্যন্ত প্রায় অর্ধশতাধিক সদস্য গ্রেপ্তার হলেও আইনি ফাঁকফোকরে তারা দ্রুত জামিনে বেরিয়ে আসছে। আর জামিনে ফিরেই তারা মেতে উঠছে ‘সিনিয়র-জুনিয়র’ দ্বন্দ্ব ও প্রতিশোধের হিংস্র খেলায়। সম্প্রতি খালিশপুরে ‘আর জে রাফি’ নামক একটি কিশোর গ্যাংয়ের সন্ত্রাসীদের হাত থেকে প্রাণ বাঁচাতে সৌরভ নামের এক কলেজ শিক্ষার্থী চারতলা ভবন থেকে লাফ দিয়ে গুরুতর আহত হন, যিনি বর্তমানে খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে লড়ছেন। নিরালা এলাকাতেও দুই গ্রুপের প্রকাশ্য রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে খুলনায় কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধ এর ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে।

রাজনৈতিক আশ্রয় ও গডফাদারদের আদ্যোপান্ত

কেএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো: রাশিদুল ইসলাম জানান, মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় ১০ থেকে ১২টি গ্যাং অত্যন্ত তৎপর, যার শিকার হচ্ছে স্কুল থেকে ঝরে পড়া শিশু-কিশোররা। রাজিন হত্যাকাণ্ডের পর গ্রেপ্তার হওয়া ৪ জনই মূলত ডেঞ্জার ও গোল্ডেন গ্যাংয়ের সদস্য। তবে নাগরিক নেতা অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে ডিবির (ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চ) ও পুলিশের কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অপরাধীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন।

গ্যাংয়ের নামপ্রধান অপরাধের ধরননিয়ন্ত্রিত এলাকা
ডেঞ্জার বয়েজছিনতাই, মাদক ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডবয়রা ও বৈকালী এলাকা
গোল্ডেন বয়েজচাঁদাবাজি, কিশোর অপরাধ ও মাদকবয়রা ও বিভিন্ন স্কুল কেন্দ্রিক
টিপসি গ্রুপগ্যারেজ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় চাঁদা আদায়বয়রা পালপাড়া এলাকা

রাজনৈতিক শেল্টারের কথা অকপটে স্বীকার করে খুলনার পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান বলেন, “কিশোর গ্যাংয়ের নেপথ্যে একশ্রেণীর রাজনৈতিক নেতা রয়েছেন, যারা এদের নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছেন। আশ্রয়দাতাদের তথ্য আমাদের হাতে রয়েছে।” সম্প্রতি লবনচরার স্লুইসগেট এলাকা থেকে শাহীন হাওলাদার, শফিকুল ইসলাম অপুসহ ১৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী প্রায় অর্ধশত কিশোর অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

পাশাপাশি জেলা পুলিশ সুপার মো: তাজুল ইসলাম জানান, গডফাদারদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের ‘গ্রিন সিগন্যাল’ পেলেই সমন্বিত অভিযান শুরু হবে। কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে সচেতনতা ও আইনি পরামর্শ পেতে আপনারা বাংলাদেশ পুলিশ এর অফিশিয়াল পোর্টালে চোখ রাখতে পারেন। খুলনাবাসীর স্পষ্ট দাবি—শুধু চুনোপুঁটি কিশোরদের নয়, অনতিবিলম্বে পর্দার আড়ালের রাজনৈতিক গডফাদারদেরও আইনের আওতায় আনা হোক।