
দুই দশক আগে প্রায় নির্মূল হওয়া হাম বাংলাদেশে পুনরায় জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ২০২৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত শতাধিক শিশুর মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে এবং টিকাদানের হার আশঙ্কাজনকভাবে ৬০ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় এই সংক্রমণ তীব্র আকার ধারণ করেছে।
সংকটের মূল কারণ ও প্রশাসনিক ব্যর্থতা
বিশ্লেষক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকটের পেছনে কয়েকটি বড় কারণ রয়েছে:
- নীতিগত অদূরদর্শিতা: ২০২৪ সালের আগস্টে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ‘অপারেশনাল প্ল্যান’ বাতিল এবং ইউনিসেফের বদলে ওপেন টেন্ডারে টিকা কেনার অপরিপক্ক সিদ্ধান্তের ফলে টিকা সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে।
- টিকার তীব্র সংকট: বর্তমানে হাম-রুবেলা, পোলিও ও যক্ষ্মাসহ মোট ছয় ধরনের অত্যাবশ্যকীয় টিকার মজুত প্রায় শূন্য। এমনকি টিকা থাকলেও সিরিঞ্জের অভাবে টিকাদান ব্যাহত হওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে।
- ইমিউনিটি গ্যাপ: কোভিড পরবর্তী স্বাস্থ্যসেবার ব্যাঘাত এবং নিয়মিত মনিটরিংয়ের অভাবে শিশুদের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতি তৈরি হয়েছে। হার্ড ইমিউনিটির জন্য যেখানে ৯৫% টিকাদান প্রয়োজন, সেখানে বর্তমানে তা ৭০% এর নিচে।
রাজনৈতিক দোষারোপ বনাম বাস্তবতা
হামের এই ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্য বিভিন্ন পক্ষ একে অপরকে দায়ী করছে:
- বিএনপি ও সচেতন নাগরিক সমাজ: তারা সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টাসহ সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
- বিশেষজ্ঞদের মত: ডা. মুশতাক হোসেনসহ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ছাড়া টিকা ক্রয় পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্তটি ছিল মারাত্মক ভুল।
- বর্তমান সরকারের চ্যালেঞ্জ: সদ্য নির্বাচিত বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার শুরুতেই এই বড় পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছে। তবে শুধু পূর্ববর্তী সরকারের ওপর দায় না চাপিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জোরালো হচ্ছে।
উত্তরণের পথ ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ
একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগে শিশুর মৃত্যু রাষ্ট্রের ব্যর্থতারই প্রতিফলন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে নিচের পদক্ষেপগুলো জরুরি:
- জরুরি টিকাদান: দ্রুত টিকা সংগ্রহ করে ‘ক্যাচ-আপ ক্যাম্পেইন’ শুরু করা।
- তদন্ত ও জবাবদিহিতা: কেন টিকা কার্যক্রম স্থবির হলো, তার নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করা।
- সমন্বিত উদ্যোগ: বিদেশি সাহায্যের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি ও গণসচেতনতা বৃদ্ধি করা।
- বাজেট ও জনবল: স্বাস্থ্যখাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ এবং দক্ষ জনবল নিয়োগের মাধ্যমে ভঙ্গুর স্বাস্থ্য কাঠামো সংস্কার করা।
পরিশেষে: শিশুদের সুরক্ষা দেওয়া একটি সভ্য রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব। রাজনৈতিক পরীক্ষার ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার না করে জনস্বাস্থ্যকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণই এখন সময়ের দাবি।